গাজাবাসীকে বাঁচাতে অস্ত্র সমর্পণে রাজি হামাস

সিটিজেন জার্নাল ডেস্ক
সিটিজেন জার্নাল ডেস্ক
গাজাবাসীকে বাঁচাতে অস্ত্র সমর্পণে রাজি হামাস
ফিলিস্তিনের গাজায় ধ্বংসস্তূপের মাঝে একটি উদ্বাস্তু শিশু

ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি চুক্তিতে রাজি হয়েছে ফিলিস্তিনের সশস্ত্র সংগঠন হামাস। এতে তাদের নিরস্ত্রীকরণ এবং গাজা উপত্যকা থেকে ধাপে ধাপে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহারের শর্ত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সম্মতিকে গাজায় নতুন ফিলিস্তিনি সরকার গঠনের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার স্বাক্ষরিত ওই চুক্তির একটি অনুলিপি তারা হাতে পেয়েছে ।

বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) স্বাক্ষরিত ওই চুক্তিতে বলা হয়েছে, আগামী ১৪ দিনের মধ্যে নিরস্ত্রীকরণের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা বা রোডম্যাপ প্রস্তুত করতে হবে। তবে ‘আন্তর্জাতিক যাচাইকরণ সংস্থা’ এবং সব পক্ষের সম্মতির ভিত্তিতে এই সময়সীমা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

হামাসের প্রতিনিধি গাজী হামাদ জানান, গাজা উপত্যকার বাসিন্দাদের হত্যা ও বাস্তুচ্যুতির হাত থেকে রক্ষা করতেই এই ছাড় দেওয়া হচ্ছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, অস্ত্র সমর্পণের বিষয়ে ইসরায়েল কোনো নাক গলাবে না। ন্যাশনাল কমিটি ফর অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা কাজটি সম্পন্ন করবে।

তবে হামাদ স্পষ্ট করে বলেছেন, ইসরায়েলি বাহিনী তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হলে হামাস এই চুক্তির কোনো অংশই বাস্তবায়ন করবে না। গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে পুনর্গঠনের অগ্রগতির ওপরই নির্ভর করবে নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়া।

‘গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ’ বললেন ট্রাম্প

ট্রাম্প এই চুক্তিকে গাজার শাসনভার তদারকির জন্য তার গঠিত তথাকথিত ‘বোর্ড অব পিস’ বা শান্তি পর্ষদের একটি ‘বড় সাফল্য’ হিসেবে তুলে ধরেছেন।

বৃহস্পতিবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লেখেন, অবশেষে গাজায় একটি নতুন ফিলিস্তিনি সরকারের শাসন প্রতিষ্ঠার পথে এই চুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই সরকার ফিলিস্তিনি জনগণকে সহায়তার জন্য বোর্ড অব পিসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে।

তিনি আরও লেখেন, একই সময়ে ইসরায়েল তার কাঙ্ক্ষিত নিরাপত্তা পাবে এবং গাজা আর কখনও সন্ত্রাসী হামলার ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হবে না।

ইসরায়েলের হামলায় গাজা সিটির আল-মুত্তাকিন মসজিদে আগুন ধরে যায়
ইসরায়েলের হামলায় গাজা সিটির আল-মুত্তাকিন মসজিদে আগুন ধরে যায়

চুক্তিতে যা আছে

চুক্তির অনুলিপি অনুযায়ী, গাজায় একটি ‘ন্যাশনাল কমিটি’ এবং ‘ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স’ প্রবেশের মধ্য দিয়ে নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়া শুরু হবে।

ন্যাশনাল কমিটি অস্ত্র ‘তালিকাভুক্ত ও মজুদ’ করার প্রক্রিয়া তদারকি করবে। আন্তর্জাতিক যাচাইকরণ কমিটি এই প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করবে এবং ফিলিস্তিনি সংগঠনগুলো তাতে অংশ নেবে।

নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়াটি গাজা থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর পর্যায়ক্রমিক সেনা প্রত্যাহারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত।

চুক্তিতে বলা হয়েছে, ইসরায়েল বা ফিলিস্তিন-বহির্ভূত কোনো সংস্থার কাছে অস্ত্র হস্তান্তর করা হবে না এবং গাজায় একমাত্র ন্যাশনাল কমিটিই এসব অস্ত্রের নিয়ন্ত্রক হবে।

বোর্ড অব পিসের একজন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, গাজার প্রশাসনিক দায়িত্ব নিতে যাওয়া ন্যাশনাল কমিটির কাছেই হামাস এবং অন্যান্য সশস্ত্র সংগঠন অস্ত্র সমর্পণ করবে।

ওই কর্মকর্তা জানান, শুরুতে পুলিশের হাতে থাকা অস্ত্রগুলো হস্তান্তর করা হবে, এরপর পর্যায়ক্রমে ভারী অস্ত্রগুলো নিষ্ক্রিয় করা হবে। এই পরিকল্পনার আওতায় গাজায় সব ধরনের সামরিক কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে। তবে প্রক্রিয়াটি বাস্তবায়নে বেশ কিছুটা সময় লাগবে।

যুদ্ধবিরতি ও বর্তমান পরিস্থিতি

ট্রাম্প এই নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়াকে গত অক্টোবরে তার মধ্যস্থতায় হওয়া ‘যুদ্ধবিরতি’ চুক্তির একটি অংশ হিসেবে তুলে ধরেছেন। গাজায় ইসরায়েলের নৃশংস অভিযানে ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার পর ওই ‘যুদ্ধবিরতি’ চুক্তি হয়েছিল।

তবে ইসরায়েল বারবার এই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় ১২শর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ফিলিস্তিনিদের আরও ভূমি ইসরায়েল দখল করে নিয়েছে। গাজায় মানুষ ও পণ্য চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ অব্যাহত রাখা হয়েছে। বৃহস্পতিবারও (৩০ জুলাই) গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ৩ শিশুসহ ৬ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

কায়রোতে আলোচনা

যুদ্ধবিরতি চুক্তি নিয়ে মিসর, কাতার এবং তুরস্কের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে আলোচনা করতে গত সপ্তাহের শেষ দিক থেকেই কায়রোতে অবস্থান করছেন হামাস নেতারা।

মিসরের সম্প্রচারমাধ্যম আল-কাহেরা নিউজ জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাহিনীর মোতায়েন এবং ন্যাশনাল কমিটির কাজ শুরুর প্রস্তাবটি হামাস ও অন্যান্য ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী ‘আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করেছে’। যুদ্ধবিরতি রূপরেখার দ্বিতীয় ধাপের প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করতে মিসর শিগগিরই কায়রোতে আবারও বৈঠকের আয়োজন করবে।

/এফসি/