শিশু-কিশোরের হাতে স্মার্টফোন, শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ কমেছে

সিটিজেন জার্নাল ডেস্ক
সিটিজেন জার্নাল ডেস্ক
শিশু-কিশোরের হাতে স্মার্টফোন, শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ কমেছে
কিশোরের হাতে স্মার্টফোন

দেশের শিশু-কিশোরদের একটি বড় অংশের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বিরূপ প্রভাব ফেলছে মোবাইল আসক্তি। একেবারে অল্প বয়স থেকেই শিশুরা স্মার্টফোনে আসক্ত হয়ে পড়ছে। ছোট শিশুদের খাওয়ানো বা শান্ত রাখতে স্মার্টফোনে কার্টুন কিংবা আকর্ষণীয় কোনো কনটেন্ট দেখাচ্ছেন অনেক বাবা-মা।

বেশির ভাগ শিশু-কিশোর মোবাইল ব্যবহার করছে তাদের অভিভাবকের নজরদারির বাইরে। শৈশব পেরোনোর আগেই স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সূত্রে অনেকে জড়িয়ে পড়ছে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে। সম্প্রতি দেশের ‘কিশোর গ্যাং’ সংস্কৃতির যে বিস্তার তাতে বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে স্মার্টফোনে টিকটকের ব্যবহার।

গবেষকরা দেখেছেন, মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা ইন্টারনেট গেমে আসক্তি অনেকটা নেশাদ্রব্যে আসক্তির মতো। পর্দার বিনোদন মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণ করে। প্রাপ্তবয়স্ক তো বটেই, এমনকি শিশুদের মনেও এ ডোপামিন আনন্দের অনুভূতি এবং আসক্তি তৈরি করে।

‘সুপারভাইজড অ্যান্ড আনসুপারভাইজড স্ক্রিন টাইম অ্যান্ড ইটস অ্যাসোসিয়েশন উইথ ফিজিক্যাল, মেন্টাল অ্যান্ড সোশ্যাল হেলথ অব স্কুল-গোয়িং চিলড্রেন ইন ঢাকা, বাংলাদেশ: ক্রস-সেকশনাল স্টাডি’ শীর্ষক এক গবেষণায় উঠে এসেছে দৈনিক প্রায় সাড়ে ৪ ঘণ্টা স্মার্টফোন ব্যবহার করা ২৮ দশমিক ৩ শতাংশ শিশুর আচরণগত সমস্যা এবং ৩১ শতাংশ শিশুর অন্তত একটি মানসিক সমস্যা রয়েছে। ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ছয়টি স্কুলের ৪২০ জন শিক্ষার্থীর ওপর ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের জুনের মধ্যে গবেষণাটি পরিচালিত হয়।

শিক্ষকরা বলছেন, শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে এখন আগের তুলনায় কম মনোযোগী। তারা রিলস-ভিডিও দেখতে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ায় কোনো কিছু পড়ার বিষয়ে আগ্রহ কমে গেছে। মনোযোগ না দেয়ায় তারা ক্লাসের পড়া অনেক সময় সঠিকভাবে বুঝতে পারে না।

‘এক্সপ্লোরিং স্মার্টফোন ইউজ অ্যামং সেকেন্ডারি স্কুল স্টুডেন্টস ইন আ রুরাল স্কুল ইন বাংলাদেশ: আ ক্রস-সেকশনাল পাইলট স্টাডি’ শীর্ষক গবেষণায় উঠে এসেছে– মাত্র ১৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ শিক্ষার্থী পড়াশোনার কাজে স্মার্টফোন ব্যবহার করেন। অবশিষ্ট শিক্ষার্থীরা বিনোদন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য স্মার্টফোন ব্যবহার করেন। এসব শিক্ষার্থীর মধ্যে স্মার্টফোন ব্যবহার শুরুর পর ৬৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ তাদের মনোযোগ কমে যাওয়া এবং ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শিক্ষার্থী খারাপ ফলের কথা জানিয়েছে।

শিক্ষকরা বলছেন, শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে এখন আগের তুলনায় কম মনোযোগী। তারা রিলস-ভিডিও দেখতে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ায় কোনো কিছু পড়ার বিষয়ে আগ্রহ কমে গেছে। মনোযোগ না দেয়ায় তারা ক্লাসের পড়া অনেক সময় সঠিকভাবে বুঝতে পারে না।

‘স্ক্রিন টাইম অ্যান্ড ইটস অ্যাসোসিয়েশন উইথ ফিজিক্যাল, মেন্টাল অ্যান্ড সোশ্যাল হেলথ অব স্কুল-গোয়িং চিলড্রেন ইন ঢাকা, বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণায় স্মার্টফোন ব্যবহারের ফলে শিশুদের বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত জটিলতার বিষয়টি উঠে এসেছে। মোবাইল ফোন ব্যবহার করা স্কুলপড়ুয়া শিশুদের ৯৩ দশমিক ১ শতাংশ ঝাপসা দৃষ্টি, ৮০ শতাংশ মাথাব্যথা, ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ চোখের সমস্যা, ৪৫ দশমিক ৭ শতাংশ ঘাড় ব্যথাসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছে। এছাড়া প্রায় ২০ শতাংশ শিক্ষার্থী ঘুমের সমস্যার কথা উল্লেখ করেছে। এছাড়া দেশে শিশু-কিশোরদের প্রায় ৫৬ শতাংশই মোবাইল ব্যবহার করে অভিভাবকের নজরদারির বাইরে।

সম্প্রতি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ১৩ বছর বয়সী একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যার শিকার হন। ১৮ সেপ্টেম্বর বিকালে অপ্রতিম তার মায়ের আইফোন নিয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিল ছবি তোলার উদ্দেশ্যে। নিখোঁজের প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ের পাদদেশ থেকে অপ্রতিমের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়।

এমন পরিস্থিতি শিশুদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অনেক শিশু স্মার্টফোনের সূত্রে সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছে আবার অনেকে অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। স্মার্টফোনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকেন্দ্রিক বিভিন্ন গ্রুপ ও যোগাযোগকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে কিশোর গ্যাং গড়ে উঠছে।

সম্প্রতি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ১৩ বছর বয়সী একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যার শিকার হন। ১৮ সেপ্টেম্বর বিকালে অপ্রতিম তার মায়ের আইফোন নিয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিল ছবি তোলার উদ্দেশ্যে। নিখোঁজের প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ের পাদদেশ থেকে অপ্রতিমের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে যে সরাসরি অংশ নেওয়া তিনজন টিকটককেন্দ্রিক কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য। অপ্রতিমের সঙ্গে তাদের আগে থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সূত্রে পরিচয় ছিল।

শিশুদের মোবাইল আসক্তি ও বিভিন্ন নেতিবাচক চর্চায় জড়িয়ে পড়ার পেছনে খেলার মাঠ না থাকাসহ শিশুদের উপযোগী বিনোদনের ঘাটতিকে কারণ মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে ঢাকাসহ সারা দেশে সক্রিয় রয়েছে ৩৮৬টি কিশোর গ্যাং। এসব গ্যাংয়ের সদস্য অন্তত ৪ হাজার ২৫০ জন। সবচেয়ে বেশি কিশোর গ্যাং রয়েছে ঢাকা মহানগরে। এখানে ১৫৯টি গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত ১ হাজার ৮১২ জন। ঢাকার পর সবচেয়ে বেশি কিশোর গ্যাং রয়েছে চট্টগ্রাম মহানগরে– ৯৮টি। এছাড়া সিলেট মহানগরে ১৫টি, রাজশাহী ও গাজীপুর মহানগরে ১৩টি করে এবং খুলনা মহানগরে ৭টি গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা ছিনতাই, হামলা, মাদক সেবন-ব্যবসাসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

ইউনেস্কো জানাচ্ছে, শিশুদের স্মার্টফোন আসক্তি নিয়ে উদ্বেগ শুধু বাংলাদেশে নয়। এটি এখন বৈশ্বিক সমস্যা। গত কয়েক বছরে বিশ্বের একের পর এক দেশ স্কুলে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করার নীতি গ্রহণ করেছে। বর্তমানে বিশ্বের অন্তত ১১৪টি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বিদ্যালয়ে শিশুদের মোবাইল ফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিশ্বের সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা চালু করে। এর পর চলতি বছরের মার্চে ইন্দোনেশিয়া ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের বেশির ভাগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেয়া শুরু করে। একই পথে হেঁটেছে মালয়েশিয়া। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যও ২০২৭ সালের শুরু থেকে শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।

শিশুদের মোবাইল আসক্তি ও বিভিন্ন নেতিবাচক চর্চায় জড়িয়ে পড়ার পেছনে খেলার মাঠ না থাকাসহ শিশুদের উপযোগী বিনোদনের ঘাটতিকে কারণ মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, মোবাইল আসক্তির পেছনে নগর অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। নগরীতে পর্যাপ্ত মাঠ নেই। স্কুল, কলেজ, মাদরাসায় মাঠ নেই। আমাদের নগর নীতি ধীরে ধীরে শিশুদের মাঠবিমুখ করে মানসিকভাবে ‘বিকলাঙ্গ প্রজন্ম’ তৈরি করছে। শিশুর বিকাশের বিষয়টি এদেশের সরকারের গুরুত্বের তালিকায় নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. একেএম রেজাউল করিম মনে করেন, কেবল মোবাইল ব্যবহার করলেই কোনো শিশু অপরাধে জড়িয়ে পড়ে না– বরং তারা ডিভাইসে কী ধরনের কনটেন্ট দেখছে (যেমন: সাইবার বুলিং, নেতিবাচক কনটেন্ট, এক্সপ্লয়েটেশন) সেটাই মুখ্য। অনুকরণপ্রিয় শিশুরা অনলাইনের এ-জাতীয় ক্ষতিকর বিষয়গুলো দেখে বিভ্রান্ত ও প্রভাবিত হতে পারে।

তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে শিক্ষা ও দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে ওঠায় ডিজিটাল ডিভাইস বা মোবাইল ব্যবহার একেবারে বন্ধ করে দেয়া কোনো সমাধান হতে পারে না। মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ডিভাইস ব্যবহারের নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ও ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিত করা। শিশুদের অবসর বা বিনোদনের জন্য ডিভাইস ছাড়াও বিকল্প কিছুর সুযোগ ও পরিবেশ তৈরি করে দেয়া দরকার। এছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে ইন্টারনেটে অনিয়ন্ত্রিত ও ক্ষতিকর কনটেন্টের প্রচার বন্ধে নীতিমালা তৈরি করার পাশাপাশি বয়সভিত্তিক কনটেন্টের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।

/এফসি/