চীন থেকে ৩০ লাখ গাড়ি ফেরত নিচ্ছে টেসলা, নেপথ্য কী

সিটিজেন জার্নাল ডেস্ক
সিটিজেন জার্নাল ডেস্ক
চীন থেকে ৩০ লাখ গাড়ি ফেরত নিচ্ছে টেসলা, নেপথ্য কী
ইলন মাস্কের মালিকানাধীন টেসলার গাড়ি

বৈদ্যুতিক গাড়ির দরজার হাতলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের জেরে চীনের বাজার থেকে প্রায় ৪৩ লাখ গাড়ি ফেরত নিচ্ছে ইলন মাস্কের মালিকানাধীন টেসলাসহ আটটি গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। গাড়িগুলোতে ব্যবহৃত রিট্র্যাকটেবল ডোর হ্যান্ডল দুর্ঘটনার সময় ঠিকমতো কাজ না করলে যাত্রীদের দ্রুত গাড়ি থেকে বের হতে সমস্যা হতে পারে-এমন আশঙ্কা থেকেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

চীনের বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা জানিয়েছে, টেসলার পাশাপাশি গিলি, ডংফেং, শাওমি, চেরি, বেইজিং অটোমোটিভ, ফার্স্ট অটো ওয়ার্কস, লিপমোটর ও এক্সপেংকে বিভিন্ন মডেলের গাড়ি বাজার থেকে ফিরিয়ে নিতে হবে। এর মধ্যে প্রায় ৩০ লাখ গাড়ি টেসলার। বাকি আট নির্মাতাকে সম্মিলিতভাবে প্রত্যাহার করতে হবে প্রায় ১৩ লাখ গাড়ি।

গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, গাড়িগুলো ফেরত আনার পর দরজার হাতলের অবস্থান সহজে শনাক্ত করার জন্য সেখানে স্পষ্ট নির্দেশনামূলক স্টিকার লাগানো হবে। পাশাপাশি সফটওয়্যার আপডেট করা হবে। দুর্ঘটনার পর গাড়ির বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও জানালা স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হবে, যাতে ভেতরে থাকা যাত্রীরা দ্রুত বের হওয়ার সুযোগ পান।

চীনে বৈদ্যুতিক গাড়ির দরজার হাতল নিয়ে নিরাপত্তা সংশয় অবশ্য নতুন নয়। গাড়িতে আগুন লাগা বা বড় ধরনের দুর্ঘটনার পর চালক, যাত্রী এবং উদ্ধারকারীদের দরজার হাতল খুঁজে পেতে সমস্যায় পড়ার একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে। বিশেষ করে দুর্ঘটনার পর দ্রুত গাড়ি থেকে বের হতে না পারার আশঙ্কা থেকেই বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

রিট্র্যাকটেবল ডোর হ্যান্ডলের বড় অংশই বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। দুর্ঘটনায় গাড়ির বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে হাতলও অচল হয়ে পড়তে পারে। অনেক গাড়ির বৈদ্যুতিক দরজার লক আবার আলাদা ১২ ভোল্টের ব্যাটারির ওপর নির্ভরশীল। দুর্ঘটনার সময় সেই ব্যাটারির সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে দরজা খোলার বৈদ্যুতিক ব্যবস্থাও অকার্যকর হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এমন পরিস্থিতিতে বিকল্প হিসেবে থাকা ম্যানুয়াল লিভার ব্যবহার করাও সহজ নয়। অনেক গাড়িতে জরুরি দরজা খোলার লিভারটি মূল হাতলের কাছাকাছি না থাকায় বিপদের মুহূর্তে সেটি খুঁজে পেতে সময় লাগে। আগুন বা দুর্ঘটনার মতো সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিতে এই সামান্য বিলম্বও যাত্রীদের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

এই নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় গত ফেব্রুয়ারিতে চীনের নিয়ন্ত্রক সংস্থা নতুন গাড়িতে সম্পূর্ণ রিট্র্যাকটেবল ডোর হ্যান্ডল ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্ত নেয়। আগামী বছর থেকে নতুন গাড়িতে এ ধরনের হাতল ব্যবহার করা যাবে না। তবে এমন আংশিক প্রত্যাহারযোগ্য হাতল ব্যবহার করা যাবে, যেগুলো গাড়ির বডির সঙ্গে পুরোপুরি সমতল হয়ে যায় না।

বৈদ্যুতিক গাড়ির দরজার হাতল নিয়ে শুধু চীনেই নয়, যুক্তরাষ্ট্রেও নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। দেশটির জাতীয় মহাসড়ক ট্রাফিক নিরাপত্তা প্রশাসন এ বিষয়ে নতুন বিধিমালা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে নতুন নিয়ম প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। এর প্রভাব মূলত ভবিষ্যতে বাজারে আসা নতুন গাড়িগুলোর ওপর পড়বে।

বিশ্বে বৈদ্যুতিক গাড়ির সবচেয়ে বড় বাজার চীন। দেশটির জিয়াংসি নিউ এনার্জি টেকনোলজি ইনস্টিটিউটের গাড়ি প্রযুক্তি গবেষণা বিভাগের ডিন ডেভিড ঝাংয়ের মতে, একসঙ্গে এত বিপুলসংখ্যক গাড়ি প্রত্যাহারের ঘটনা থেকে বোঝা যায়, বৈদ্যুতিক গাড়ির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মান নির্ধারণকে চীন কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে।

তবে এই নিরাপত্তা ইস্যু শুধু টেসলা বা চীনা নির্মাতাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিএমডব্লিউ, ফোর্ড ও হুন্দাইয়ের মতো প্রতিষ্ঠিত পশ্চিমা ও এশীয় গাড়ি নির্মাতারাও বিভিন্ন মডেলে বৈদ্যুতিক বা রিট্র্যাকটেবল ডোর হ্যান্ডল ব্যবহার করছে। এমনকি কিছু পেট্রোল-ডিজেল চালিত ও হাইব্রিড গাড়িতেও একই ধরনের দরজার ব্যবস্থা দেখা যায়। ফলে গাড়ির নকশায় আধুনিকতার পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ও সহজে দরজা খোলার বিষয়টিও এখন বিশ্বজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা প্রশ্ন হয়ে উঠছে।

/এসবি/